প্রিয়াংশু মণ্ডল, প্রতিনিধি
ময়দান আপডেট: ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে বিশেষ করে ফুটবলে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিন ধরে যে আইনি জটিলতার কারণে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশি ফুটবলাররা নীল জার্সি গায়ে চাপাতে পারছিলেন না, এবার সেই জট কাটার ইঙ্গিত পাওয়া গেলো। ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিজ দেশের নাগরিকত্ব না ছেড়েই ভারতের হয়ে খেলার বিষয়টিতে এক বড়ো অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। ভারত সরকারের ক্রীড়ামন্ত্রকের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে (PMO) একটি বিশেষ ‘স্পোর্টস পাসপোর্ট’ চালু করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এই প্রস্তাব সবুজ সংকেত পেলে ফুটবল, বাস্কেটবল এবং টেনিসের মতো বিশ্বমানের খেলাগুলোতে ভারতের শক্তি এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আশা করছে ক্রীড়ামহল।

এটি হলো এমন এক বিশেষ ব্যবস্থা যা ভারতের দ্বৈত নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) না দেওয়ার কঠোর আইনকে স্পর্শ না করেই বিদেশি প্রতিভাদের দেশের পক্ষে খেলার সুযোগ করে দেবে। ওভারসিজ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া (OCI) কার্ডধারী এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম সারির ক্রীড়াবিদগণ এই সুবিধা পাবেন। এই পাসপোর্টধারী খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। তবে তাঁদের ভারতের স্থায়ী নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার থাকবে না। এর ফলে ভারতের প্রচলিত নাগরিকত্ব আইন কোনোভাবেই লঙ্ঘিত হবে না, অথচ জাতীয় দলগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা বা এশিয়ার অন্যান্য দেশের লিগে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এমন বহু ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলার আছেন, যাঁরা ভারতের হয়ে খেলতে অত্যন্ত আগ্রহী। কিন্তু ভারতের আইন অনুযায়ী অন্য দেশের নাগরিকত্ব না ছাড়লে ভারতের হয়ে খেলা সম্ভব নয়। ক্যারিয়ারের খাতিরে ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় নাগরিকত্ব ছাড়া এই তরুণ প্রতিভাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিলো না। স্পোর্টস পাসপোর্ট চালু হলে এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে।ফুটবল, বাস্কেটবল এবং টেনিসের মতো খেলায় গতি, শারীরিক গঠন এবং আন্তর্জাতিক এক্সপোজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওসিআই কার্ডধারী খেলোয়াড়রা দলে এলে ভারতীয় দলগুলোর শক্তি রাতারাতি বিশ্বমানের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে।
বিশ্ব ক্রীড়ামঞ্চে এই ধারণা অবশ্য একদম নতুন নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার দীর্ঘদিন ধরেই এই ‘স্পোর্টস পাসপোর্ট’ সফলভাবে ব্যবহার করে আসছে। অন্য দেশের প্রতিভাদের এই পাসপোর্টের আওতায় এনে তারা নিজেদের জাতীয় দলকে শক্তিশালী করেছে। এর সবচেয়ে বড় এবং সাম্প্রতিক উদাহরণ হলেন তাহসিন মহম্মদ জামশিদ। কেরালার সন্তান তাহসিন এখনও জন্মসূত্রে ভারতের পাসপোর্টধারী। কিন্তু কাতারের দেওয়া স্পোর্টস পাসপোর্ট বা বিশেষ ক্রীড়া নাগরিকত্ব নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে কাতারের জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন। এমনকি ফিফা বিশ্বকাপেও কাতারের স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছেন এই তরুণ তুর্কি। কাতার যদি ভারতীয় যুবকদের নিজেদের দেশের হয়ে খেলাতে পারে, তবে ভারত কেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয় প্রতিভাদের ঘরে ফেরাবে না, এই প্রশ্নটাই অনেকদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো ভারতীয় ফুটবল মহলে। এবার তারই সদুত্তর মিলতে চলেছে। যদি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এই প্রস্তাবে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়ে, তবে ভারতীয় ফুটবলের খোলনলচে বদলে যেতে বাধ্য। ঘরোয়া লিগের প্রতিভাদের পাশাপাশি যখন ইউরোপের নামী একাডেমিতে তৈরি হওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা যোগ দেবেন, তখন এশিয়ান কাপ বা ফিফা বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের মূল মঞ্চে ভারতের লড়াইটা আর স্বপ্নাতীত থাকবে না।ক্রীড়াপ্রেমীরা এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সিদ্ধান্তের দিকে। এই স্পোর্টস পাসপোর্ট পাস হওয়া মানেই ভারতীয় ক্রীড়াজগতে এক নতুন ভোরের সূচনা।
