প্রিয়াংশু মন্ডল, প্রতিনিধি
ময়দান আপডেট : ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাত্র ৬৩ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন ১৮ বছরের এক তরুণ। সেই বিষাদময় সূচনার পর দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের রাজত্ব শাসন করে, ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয়ের পর অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেন লিওনেল মেসি।
তার এই দুই দশকের সফরটি ছিল চরম অধঃপতন, চরম ক্ষোভ, নাটকীয় পুনরুত্থান এবং অবশেষে বিশ্বজয়ের এক মহাকাব্যিক গল্প। শুরুর দিনগুলো মেসির জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। ক্লাবের হয়ে একের পর এক ট্রফি ও বালন ডি’অর জিতলেও, জাতীয় দলের জার্সিতে তাকে টানা ব্যর্থতার তিক্ততা স্বাদ পেতে হয়। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, আর তার পর পর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে পরাজয় তাকে চরমভাবে ভেঙে ফেলেছিল। নিজ দেশের সমর্থকদের সমালোচনা ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ২০১৬ সালে ক্ষোভে ও কান্নাভেজা চোখে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে প্রথমবার অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তিনি।

কিন্তু ফুটবলের বিধাতা হয়তো তার জন্য অন্য গল্প লিখেছিলেন। দেশবাসীর আবেগ আর ভালোবাসার ডাকে সাড়া দিয়ে আবার নীল সাদা জার্সিতে ফেরত আসেন তিনি। কোচ লিওনেল স্কালোনির আগমনের পর মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নতুনভাবে জীবন পায়। ২০২১ সালে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে তার বহু প্রতীক্ষিত ট্রফি খরা কাটে। এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মেসি দেখান তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পারফরম্যান্স। দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে, প্রতিটি ম্যাচে জাদুকরী গোল ও অ্যাসিস্ট করে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বসেরার মুকুট এনে দেন। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা (GOAT) হিসেবে নিজেকে চিরতরে প্রতিষ্ঠিত করেন মেসি, যার ঝুলিতে জমা হয় ৮টি বালন ডি’অর ও রেকর্ড সংখ্যক দলগত ট্রফি। কিন্তু সময়ের নির্মম নিয়মে শেষটাও এলো আগস্টেরই এক বিষাদময় বিকেলে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ অভিযানে শেষ ট্রফি ধরে রাখার লড়াইয়ে নেমেছিল আর্জেন্টিনা।
তবে অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি এক ম্যাচে পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের। সেই পরাজয়ের পরপরই ২০২৬ সালের আগস্টে চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজের চূড়ান্ত অবসরের ঘোষণা দেন লিওনেল মেসি। ২০০৫ এর আগস্টে যে পথচলা লাল কার্ডের বিষাদ দিয়ে শুরু হয়েছিল, ২০২৬ এর আগস্টে এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়েই শেষ হলো ফুটবলের সবচেয়ে বর্ণময় অধ্যায়। পরাজয় দিয়ে শেষ হলেও, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার রেখে যাওয়া অবদান ও অমর ঐতিহ্য চিরকাল অমলিন থাকবে। তাদের দেশের এবং ভক্তদের কথা মাথায় রেখে তিনি একটি ফেয়ারওয়েল ম্যাচ খেলবেন।
