ময়দান আপডেট: যখনই লা রোহা এবং ফরাসি ব্রিগেড একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখনই মাঠের লড়াই রূপ নেয় এক জাদুকরী ফুটবল মহাকাব্যের। স্পেন এবং ফ্রান্স বিগত কয়েকটি বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স গ্রাফ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ফ্রান্স যেখানে ধারাবাহিকভাবে ফাইনাল খেলে নিজেদের রাজত্ব টিকিয়ে রেখেছে, স্পেন সেখানে তিকিতাকার খোলস ছেড়ে নতুন ও আধুনিক আক্রমণাত্মক ফুটবলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিগত কয়েকটি বিশ্বকাপে ফরাসিদের পারফরম্যান্স এককথায় অবিশ্বাস্য। ২০১৪ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিলেও, ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও তারা ফাইনালে পৌঁছায় এবং আর্জেন্টিনার সঙ্গে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনাল খেলে টাইব্রেকারে হেরে রানার্স-আপ হয়। অপরদিকে, ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এরপরের কয়েকটি বিশ্বকাপে কিছুটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব এবং ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে রাউন্ড অফ ১৬ থেকে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। তবে বর্তমান তরুণ ও ক্ষিপ্র গতিময় দলটিকে নিয়ে তারা আবারও বিশ্বমঞ্চের শীর্ষস্থানে ফিরে এসেছে।

বিশ্বকাপের শেষ চারের মঞ্চ বা সেমিফাইনালে ওঠার ক্ষেত্রে দুই দলেরই রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বড় ম্যাচ জয়ের দারুণ অভিজ্ঞতা। ফুটবল ইতিহাসে ফ্রান্স এই পর্যন্ত মোট ৭ বার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে। এরমধ্যে প্রথম ৩ বার তারা ব্যর্থ হলেও, শেষ ৪ বারই তারা সেমিফাইনাল জিতে ফাইনালে পা রেখেছে। যার মধ্যে দুইবার ১৯৯৮ ও ২০১৮ তারা ট্রফি জিতেছে। স্পেনের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার ইতিহাস খুব বেশি দীর্ঘ নয়, তবে তাদের রেকর্ড নিখুঁত। ফুটবল ইতিহাসে স্পেন মাত্র ১ বার সেমিফাইনাল ম্যাচ খেলেছে। সেই ম্যাচে জার্মানিকে ১-০ গোলে হারিয়ে তারা ফাইনালে ওঠে এবং নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।

আন্তর্জাতিক ফুটবল, ইউরো কাপ এবং বিশ্বকাপ মিলিয়ে এই দুই প্রতিবেশী দেশের দ্বৈরথ সবসময়ই সমানে সমানে এবং অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে।দুই দল এই পর্যন্ত সর্বমোট ৩৬ বার মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে স্পেন জয় পেয়েছে ১৬ ম্যাচে ও ফ্রান্স জয় পেয়েছে ১৩ ম্যাচে এবং বাকি ৭টি ম্যাচ অমিমাংসিতভাবে শেষ হয়েছে। তবে বড়ো টুর্নামেন্টের মঞ্চে ফ্রান্সের রেকর্ড বেশ ভালো, বিশেষ করে ১৯৮৪ ইউরো ফাইনাল কিংবা ২০২১ নেশনস লিগের ফাইনালে স্পেনকে হারিয়েছিল ফরাসিরা। তবে স্পেনের ১৬টি জয় প্রমাণ করে যে সামগ্রিক আধিপত্যে তারা ফরাসিদের চেয়ে সামান্য এগিয়ে রয়েছে।
লামিন ইয়ামাল এই তরুণ সেনসেশন উইং ধরে তাঁর অবিশ্বাস্য গতি, ড্রিবলিং এবং নিখুঁত ক্রসিং দিয়ে ফ্রান্সের শক্তিশালী ডিফেন্সে ফাটল ধরাতে পারেন।রদ্রি স্প্যানিশ মাঝমাঠের আসল ইঞ্জিন। ফ্রান্সের আক্রমণভাগের সঙ্গে ডিফেন্সের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং মাঝমাঠের দখল ধরে রাখার মূল দায়িত্ব থাকবে তাঁর ওপর। মিকেল মোরিনো সুপার সাব হয়ে উঠেছেন স্পেনের জন্য। শেষ দুটি ম্যাচে সাবস্টিটিউট এসে দুটি জয়সূচক গোল করেছেন। তাই তার দিকেও নজর থাকবে। কিলিয়ান এমবাপ্পে ফরাসিদের অধিনায়ক ও প্রধান খেলোয়াড়। তাঁর অতিমানবীয় গতি এবং ডি বক্সের ভেতর নিখুঁত ফিনিশিং স্পেনের হাইলাইন ডিফেন্সের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। আন্তোয়ান গ্রিজম্যান মাঝমাঠ এবং আক্রমণের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি করতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ফরাসি দলের আক্রমণের রূপরেখা তৈরি হয় তাঁর পা থেকেই। এছাড়াও আক্রমণভাগে ওসমান ডেম্বেলে, মিকাইল ওলিসে ও ডেজায়ার ডৌ – দের দিকেও নজর থাকবে। একদিকে স্পেনের তিকিতাকার আধুনিক সংস্করণ ও পাসিং ফুটবল, অন্যদিকে ফ্রান্সের কাউন্টার-অ্যাটাকিং গতি ও শারীরিক ফুটবলের ক্ষমতা। ইউরোপের সেরা দুই শক্তির এই মহালড়াই যে চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ হতে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
