সৌরভ রায়, সম্পাদক
ময়দান আপডেট: তখনও কলকাতায় নিভু-নিভু হালকা শীতের আমেজ। সবে মাত্র মার্চ মাসের ১১ তারিখ। তার কয়েকদিন আগেই বর্ডার গাভাসকর ট্রফিতে মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়েতে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে লাল বলের ক্রিকেটে অপ্রতিরোধ্য অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১০ উইকেটে লজ্জার হার হজম করতে হয়েছে অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের দলকে। গ্লেন ম্যাকগ্রা, শেন ওয়ার্ন, জেসন গ্রিলিসপিদের বোলিং দাপটে ক্রিকেট গড তেন্ডুলকরের ভূমিতে ধরাশায়ী হয় ভারতীয় ব্যাটিংলাইন। ফলে সেলিব্রেশন মুডে তখন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে সিটি অফ জয় কলকাতায় দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে হাজির স্টিভ ওয়ার দল। সালটা ২০০১ সালের মার্চ মাস। ঘরের মাঠে কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে তখন দাঁড়িয়ে বর্তমান সিএবি সভাপতি তথা তৎকালীন ভারতীয় দলের অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। আর সেই টেস্টেও ইডেন গাডেন্সে স্টিভ ওভার সেঞ্চুরি ও ম্যাথু হেডেনের ৯৭ রানের ইনিংসে ভর করে ভারতের সামনে ৪৪৫ রানের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড় করিয়ে ভারতকে ব্যাট করতে পাঠায় অস্ট্রেলিয়া। আর জবাবে ভারত ব্যাট করতে নেমে ভিভিএস লক্ষ্ণণের একটা হাফসেঞ্চুরি ছাড়া, কোনও চমকই ছিল না। মাত্র ১৭১ রানে ভারতকে অলআউট করে, ফের দ্বিতীয়বার ভারতকে ফলোঅনে ব্যাট করতে পাঠায় অজি বাহিনী। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে গিয়ে ৪ উইকেট পড়ে যাওয়া ভারতীয় দলকে এক বিস্ময়কর ইনিংস উপহার দিয়ে ক্রিকেটের নন্দনকাননে ইতিহাস রচনা করেছিলেন দুই কিংবদন্তি ভিভিএস লক্ষ্মণ ও রাহুল দ্রাবিড়। লাল বলের বিশ্ব ক্রিকেটের ত্রাস স্টিভ ওয়ার অস্ট্রেলিয়ার দ্বম্ভ চূর্ণ করে ৩৭৬ রানের পার্টনারশিপ গড়ে তোলেন লক্ষ্ণণ ও দ্রাবিড়। লক্ষ্ণণ করেন ৪৫২ বলে ২৮১ রান ও দ্রাবিড় ১৮০ রান। ৭ উইকেটে ৬৫৭ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে ডিক্লেয়ার দিয়ে ব্যাট করতে পাঠায় ভারত। আর ওই টেস্টে ২১২ রানে অজি বাহিনীকে দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট করে দিয়ে ১৭১ রানে টেস্ট জিতে নেয় ভারত। পাশাপাশি সেই বছর ২-১ এ বর্ডার গাভাসকর টেস্ট সিরিজ জিতে ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল টিম ইন্ডিয়া।

আর দেখতে-দেখতে ২৪ বছর পর সেই ইডেন গার্ডেন্সের স্বর্ণাক্ষরে লেখা ইতিহাসকেই ইডেন থেকে গুয়াহাটি কলঙ্কিত করল ভারতীয় ব্রিগেড। তাও অপ্রতিরোধ্য অস্ট্রেলিয়া নয়, সাম্প্রতি হয়তো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ানশিপ জেতা থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্টে সাফল্য পেয়ে আইসিসির হিসেবে লাল বলের ক্রিকেটে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে টেম্বা ভাবুমার দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে যে ভাবে আড়াই দিনে শেষ হয়ে যাওয়া ইডেন গার্ডেন্সে সাউথ আফ্রিকার কাছে ধরাশায়ী হয়েছে শুভমান গিলের দল তাতে হতবাক ক্রিকেট বিশ্ব। আর ইডেনের হারের লজ্জা হাজারোগুন চওড়া করেছে গুয়াহাটির বর্ষাপাড়া স্টেডিয়ামের চূড়ান্ত ব্যর্থতা। কারণ ৪০৮ রানের বিরাট ব্যবধানে যে ভাবে ভারতকে টেস্টে হারিয়ে ২-০ তে সিরিজ জিতে নিয়েছে প্রোটিয়ানরা, সেখানে এককথায় বলাই যায় ভারতীয় ক্রিকেটের এটা সর্বকালের কলঙ্কিত অধ্যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসেই তোলে ৪৮৯ রান। জবাবে ভারত ২০১ রানে অলআউট হয়ে যায়। তবে প্রোটিয়ান অধিনায়ক টেম্বা ভাবুমা অথচ সেই সময় দাঁড়িয়ে আন্দাজ করতে পারেননি, বর্তমানে ভারতীয় টেস্ট দলের ব্যাটিং লাইনআপের হাল এতটা করুণ হতে পারে! তাই হয়তো ফলোঅন না দিয়ে আবার ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন। আর ব্যাট করতে নেমে আফ্রিকানরা ফের ভারতের কাঁধে আরও ২৬০ রান চাপান। আর ৫০০ রানের বেশি বিরাট টার্গেটের সামনে ভারতীয় দল মাত্র কয়েক ঘণ্টা ব্যাট করেই ১৪০ রানে গুটিয়ে যায়। ফলে হিসেব বলছে সাউথ আফ্রিকার এক ইনিংসের ৪৮৯ রানও ভারত দুই ইনিংসে মিলিয়ে (৩৪১) করতে পারেনি।

ফলে এই লজ্জার হারের পর হাজারো প্রশ্নের সামনে ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীর। যদিও তিনি প্রিয়জন হারানোর মতো মন খারাপ করে সাংবাদিক সম্মেলনে আসলেও তিনি স্মরণ করিয়েছেন তাঁর আমলেই ভারত চ্যাম্পিয়ান্স ট্রফি জিতেছে, এশিয়া কাপ জিতেছে, ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট সিরিজ ড্র করেছে। বর্তমানে নাকি ‘ট্রানজিশন’ অধ্যায় চলছে ভারতীয় ক্রিকেটে। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টেস্ট সিরিজে হোয়াইট ওয়াশ কোনও ভাবেই মানতে পারছেন না ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। সবথেকে বড় প্রশ্ন ভারতীয় ক্রিকেটের এই ট্রানজিশন অধ্যায় বা খারাপ সময় আসার জন্য কি মিস্টার গম্ভীর আপনি কোনও ভাবেই দায়ি নন ? কারণ যখন আপনি জানেন আপনার দলে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের অভাব, তাহলে কেন মাত্র ৩৪ বছর বয়সে বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা যখন অবসরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন কেন আপনি তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে রাজি করানোর চেষ্টা করলেন না ? কেন অজিঙ্কা রাহানে রঞ্জিতে সেঞ্চুরি করেও টেস্ট দলে জায়গা হচ্ছে না! কেন মিস্টার ওয়াল চেতেশ্বর পূজারাকে ক্রিকেট ছেড়ে কমেনট্রি করতে হচ্ছে! কেন রবীচন্দ্রণ অশ্বিণের মতো স্পিনারকে অবসর নিতে হল ? কেন মহম্মদ শামিকে বাংলার দলের হয়ে কল্যাণীতে বল করতে হচ্ছে ? অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের বাদ দিয়ে তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে দল সাজিয়ে নিজের ক্যারিশমা দেখানোর প্রচেষ্টা কি আপনার নিজের ক্যারিয়ারকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল না ? যদিও এখনই হয়তো গম্ভীরের ব্যর্থতা নিয়ে চরম কোনও সিদ্ধান্তের পথে হাঁটতে রাজি নয় বিসিসিআই। সূত্রের খবর, আপাতত ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ পর্যন্ত ভারতের কোচের দায়িত্ব রয়েছে গম্ভীরের হাতেই। ফলে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্ধকার অধ্যায় ও চরম সমালোচনার মুখ থেকে ভারতীয় ক্রিকেটকে কি ভাবে আবার কামব্যাক করাতে পারেন স্যার মিস্টার জিজি এখন সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন!
