ময়দান আপডেট: সাম্প্রতি ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের কোচ খালিদ জামিল একটি বড়সড় ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তিনজন ভারতীয়-বংশোদ্ভূত ফুটবলার (PIO – Players of Indian Origin) নীল জার্সি গায়ে জড়ানোর লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই নিজেদের দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ভারতীয় নাগরিকত্ব নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছেন। এই মন্তব্যের পর থেকেই ফুটবল মহলে একটি পুরোনো বিতর্ক নতুন করে দানা বেঁধেছে— প্রবাসী প্রতিভাদের দলে এনে কি ভারতীয় ফুটবলের খোলনলচে বদলে দেওয়া সম্ভব? তবে এই আলোচনার মাঝেই প্রশ্ন উঠছে, একটু বেশি হাইপ্রোফাইল বা ইউরোপের প্রথম সারির লিগে খেলা ভারতীয়-বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা কেন ভারতের হয়ে খেলতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না?
গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর পিছনে রয়েছে মূলত কিছু আইনি ও পেশাদারী বাধ্যবাধকতা। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কোনো নাগরিক একসঙ্গে দুটি দেশের পাসপোর্ট রাখতে পারেন না (Dual Citizenship নিষিদ্ধ)। ফলস্বরূপ, কোনো প্রবাসী ফুটবলার যদি ভারতের হয়ে খেলতে চান, তবে তাঁকে ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশের নাগরিকত্ব সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে। ভবিষ্যৎ জীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক ফুটবলারই এই বিশাল ঝুঁকি নিতে দ্বিধাবোধ করেন।
উচ্চমানের বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের ভারতে না আসার সবচেয়ে বড়ো কারণটি লুকিয়ে রয়েছে ব্রিটিশ সরকারের কঠিন ওয়ার্ক পারমিট নীতির মধ্যে। ইংল্যান্ডের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ (EPL) বা চ্যাম্পিয়নশিপের মতো হাই-প্রোফাইল লিগে কোনো বিদেশী ফুটবলারকে খেলতে হলে, তাঁর নিজ দেশকে ফিফা ক্রমতালিকায় (FIFA Ranking) প্রথম ৭০ এর মধ্যে থাকতে হয়। বর্তমানে যে সমস্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলার ব্রিটেনের স্থানীয় নাগরিক হিসেবে সেখানকার বিভিন্ন লিগে খেলছেন, তাঁরা ভারতের নাগরিকত্ব নিলেই রাতারাতি ‘বিদেশী ফুটবলার’ হিসেবে গণ্য হবেন। যেহেতু ভারতের ফিফা র্যাঙ্কিং ৭০ এর ধারেকাছে নেই, তাই তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেনে খেলার ওয়ার্ক পারমিট হারাবেন এবং তাঁদের কেরিয়ার ধ্বংসের মুখে পড়বে। একই নিয়ম খাটে ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার সেইসব ফুটবলারদের ক্ষেত্রেও, যাঁরা নিজেদের দেশের ভালো র্যাঙ্কিংয়ের জোরে ব্রিটেনে খেলার সুযোগ পান। ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত দেশের লিগগুলোতে ভারতীয় লিগের মতোই স্থানীয় ফুটবলারদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা থাকে। যেমন স্পেনের লা লিগায় নিয়ম রয়েছে যে, মূল একাদশের ১১ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে অন্তত ৮ জনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (EU) সদস্য দেশের নাগরিক হতে হবে। ইউরোপে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা বর্তমানে এই কোটার সুবিধা পুরোদমে উপভোগ করছেন। ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে এই সমস্ত আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধা তাঁদের হাতছাড়া হয়ে যাবে।
বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে ভারত এখনো কোনো বড়ো শক্তি নয়। বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় ফুটবলের পরিচিতি যেমন কম, তেমনই দেশের ফুটবল নিয়ামক সংস্থা বা ফেডারেশনের (AIFF) প্রশাসনিক অপেশাদারিত্বও বারবার সামনে আসে। সম্প্রতি ইউনিটি কাপে মোহনবাগানের ফুটবলার ছাড়ার বিষয়ে যেভাবে যোগাযোগের অভাব দেখা গেছে, তাতেই স্পষ্ট যে পরিকাঠামো এখনো কতটা পিছিয়ে। ফুটবলারদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতীয় ফেডারেশন ভীষণ নিষ্ক্রিয়। অথচ এই জায়গাতেই উদাহরণ তৈরি করেছে ইন্দোনেশিয়া। সেদেশের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি নিজে ইউরোপে গিয়ে প্রবাসী ফুটবলারদের সাথে বৈঠক করে, তাঁদের বুঝিয়ে নিজেদের দেশের হয়ে খেলার জন্য রাজি করাচ্ছেন। ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।
অনেকেই এখানে ইংল্যান্ডে খেলা ফুটবলার হামজা চৌধুরীর উদাহরণ টানতে পারেন, যিনি ব্রিটিশ নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের হয়ে খেলার ছাড়পত্র পাচ্ছেন। এর কারণ বাংলাদেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব সমর্থন করে। ফলে হামজা একইসঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলছেন এবং ব্রিটিশ নাগরিকত্বের সুবিধা নিয়ে ইংল্যান্ডের লিগেও বুক ফুলিয়ে খেলছেন। ভারতের ক্ষেত্রে এই আইনি সুবিধা পাওয়া অসম্ভব। অন্যদিকে, অতীতে ইজুমি আরাতা বা রায়ান উইলিয়ামসের মতো ফুটবলাররা যে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন, তার প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। তাঁরা দুজনেই কেরিয়ারের শেষলগ্নে এসে ভারতের ঘরোয়া লিগে থিতু হতে চেয়েছিলেন। জাপান বা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে খেলার সুযোগ তাঁদের ছিল না। ফলে ভারতের নাগরিকত্ব নেওয়ায় তাঁরা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার স্বাদও পান, আবার ভারতের লিগে ‘লোকাল প্লেয়ার’ হিসেবে খেলে ক্লাব ফুটবল থেকেও বাড়তি সুবিধা পান। আরাতা বা রায়ানের মতো ফুটবলারদের ভারতের জার্সিতে খেলানো যতটা সহজ ছিল, ইয়ান ধান্দা, খেলা ভ্রাতৃদ্বয় কিংবা সাই সচদেবদের মতো তরুণ ও সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের ক্ষেত্রে সমীকরণটা ঠিক ততটাই জটিল। ইউরোপের নামী লিগ ও উন্নত জীবন ছেড়ে, শুধুমাত্র আবেগের টানে এত বড়ো পেশাদারী বলিদান দিয়ে তাঁরা ভারতের হয়ে খেলতে আসবেন— এমনটা আশা করা এই মুহূর্তে বেশ কঠিন। বংশোদ্ভূতদের দলে নিতে গেলে সবার আগে প্রয়োজন ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং আইনি জটিলতা নিরসনের সঠিক রূপরেখা।
