প্রিয়াংশু মণ্ডল, প্রতিনিধি
ময়দান আপডেট: কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল ফ্রান্সের। চার বছর আগের সেই ট্র্যাজিক হিরো কিলিয়ান এমবাপ্পে এখন লেস ব্লুসদের পূর্ণাঙ্গ অধিনায়ক। মাঝের এই সময়টায় ফরাসি ফুটবলে এসেছে ব্যাপক রদবদল। দিদিয়ের দেশমের অধীনে এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স মাঠে নামছে ফেভারিটের তকমা নিয়েই। এবারের বিশ্বকাপ স্কোয়াডটি ফ্রান্সের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা। গত এক দশকের ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সেরা দুই স্তম্ভ, উইঙ্গার আনতোয়ান গ্রিজম্যান এবং অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড অলিভিয়ের জিরুড আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। গ্রিজম্যানের মতো একজন চতুর প্লেমেকার এবং জিরুডের মতো নিখুঁত স্ট্রাইকারের অনুপস্থিতি দলে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। তবে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড়ো শক্তির জায়গা হলো তাদের ফুটবলার তৈরির অবিশ্বাস্য পাইপলাইন। কিলিয়ান এমবাপ্পের নেতৃত্বে একঝাঁক গতিময় উইঙ্গার, শারীরিকভাবে শক্তিশালী মিডফিল্ডার এবং বিশ্বমানের ডিফেন্ডারদের নিয়ে দেশম এবারও একটি দুর্দান্ত এবং ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড সাজিয়েছেন। ফ্রান্সের তিনকাঠীর নিচে রয়েছেন মাইগনান, রিসের ও সাম্বা। ডিফেন্সে রয়েছেন দিগনে, গুস্ত, হার্নান্দেজ, কোনাতে, কৌন্দে, ল্যাক্রোইক্স, সালিবা ও উপমেকানো। অপরদিকে মিডফিল্ডে কান্তে, কোণে, রাবিয়ট, চৌয়ামেনি ও জাইরে এমারি রয়েছেন। অ্যাটাকে রয়েছেন আকলিঔছে, বারকোলা, চেরকি, ডেম্বেলে, ডেযার ডৌ, মেটটা, এমবাপ্পে, ওলিস ও থুরাম।

গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফ্রান্সের পারফরম্যান্স ছিল মিশ্র, তবে বড়ো টুর্নামেন্টে তারা সবসময়ই পরাশক্তি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে নেমে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠে ফ্রান্স। এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক সত্ত্বেও টাইব্রেকারের ভাগ্যে রানার্স আপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। কাতার বিশ্বকাপের পর ২০২৪ ইউরো কাপে ফ্রান্সের পারফরম্যান্স কিছুটা রক্ষণাত্মক ও মন্থর ছিল। সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়। তবে টুর্নামেন্ট জুড়ে তাদের রক্ষণভাগের পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়। ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বে ফ্রান্স অত্যন্ত দাপটের সাথে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। বড়ো ম্যাচগুলোতে তাদের চেনা ছন্দ ফিরে পাওয়ার ক্ষমতা ফুটবল বিশ্বকে বারবার সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
কোচ দিদিয়ের দেশম তাঁর চেনা বাস্তবসম্মত এবং কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবল (পদ্ধতিগত ফুটবল) থেকে খুব একটা সরেননি। দলের বর্তমান ফর্ম বেশ আশাব্যাঞ্জক। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপ কাঁপানো কিলিয়ান এমবাপ্পে আছেন দারুণ ফর্মে। মাঝমাঠে ফরাসি তরুণদের শক্তির সাথে অভিজ্ঞতার যে রসায়ন তৈরি হয়েছে, তা প্রতিপক্ষের মাঝমাঠকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। রক্ষণভাগে গতি এবং ট্যাকলিংয়ের দুর্দান্ত সমন্বয় দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে। গ্রিজম্যানের অনুপস্থিতিতে এখন আক্রমণভাগের সৃজনশীলতা এবং ফাইনাল পাসের দায়িত্ব ভাগ হয়ে গেছে উইঙ্গার ও আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারদের মধ্যে। ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলাই চলে, স্কোয়াডের গভীরতা এবং বেঞ্চের শক্তি বিবেচনা করলে ফ্রান্স সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে অন্যতম শক্তিশালী দল। এমবাপ্পের গতি এবং গোল করার অতিমানবীয় ক্ষমতাই হতে পারে ফ্রান্সের প্রধান অস্ত্র। তবে ফ্রান্সের মূল শঙ্কা হতে পারে বড়ো ম্যাচে গ্রিজম্যানের মতো ‘গেম রিডার’ এর অভাব। এছাড়া দলের ভেতর খেলোয়াড়দের অহংকার বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল (যা ফরাসি দলের পুরোনো ইতিহাস) যদি দেশম শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে ফ্রান্সকে আটকানো যেকোনো দলের জন্যই কঠিন হবে। গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে নকআউট পর্বে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা ইংল্যান্ডের মতো প্রতিপক্ষদের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। সব মিলিয়ে, হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার এবং এমবাপ্পের হাত ধরে ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে আরেকটি সোনালী অধ্যায় রচনার সবরকম সামর্থ্য এই দলের রয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের ইতিহাস গড়ার লড়াই! প্রথমবার রোনাল্ডোর হাতে ট্রফি দেখার আশায় সমর্থকরা
