প্রিয়াংশু মণ্ডল, প্রতিনিধি
ময়দান আপডেট: ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কি এটিই শেষ বিশ্বকাপ? এই এক প্রশ্নকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের পুরো মিশন। তবে এবারের পর্তুগাল দল শুধু রোনাল্ডো কেন্দ্রীক নয়, বরং দলটির বর্তমান স্কোয়াডকে বলা হচ্ছে পর্তুগালের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও ভারসাম্যপূর্ণ ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’। কোচ রবার্তো মার্তিনেসের অধীনে এবার বিশ্বজয়ের এক প্রবল দাবিদার হিসেবেই আমেরিকা-মেক্সিকো-কানাডার মাটিতে পা রেখেছে সিআর সেভেন বাহিনী। এবারের পর্তুগাল স্কোয়াডের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হল তাদের অবিশ্বাস্য গভীরতা। ৪১ বছর বয়সেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন, যা ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য নজির। তাঁর এই বিশাল অভিজ্ঞতা দলের তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড়ো অনুপ্রেরণা। আক্রমণে রোনাল্ডোর সঙ্গে থাকছেন বর্তমান ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা উইঙ্গার রাফায়েল লিয়াও এবং ক্ষুরধার ফরোয়ার্ড গনসালো রামোস। মাঝমাঠের সৃজনশীলতা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকছেন ব্রুনো ফার্নান্দেস এবং বার্নার্দো সিলভা, যাঁদের বিশ্বমানের ফুটবল মস্তিষ্ক যেকোনো রক্ষণভাগকে ভেঙে চূর্ণ করতে সক্ষম। রক্ষণভাগে রুবেন দিয়াসের মতো আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার এবং গোলপোস্টে দিওগো কস্তার নির্ভরযোগ্যতা পর্তুগালকে এক নিটোল রূপ দিয়েছে।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফেভারিট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে ১-০ গোলে হেরে স্তব্ধ হতে হয়েছিল পর্তুগালকে। রোনাল্ডোকে বেঞ্চে রাখা নিয়ে সেই সময়কার বিতর্ক দলের পারফরম্যান্সে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ২০২৪ ইউরোতে রবার্তো মার্তিনেস দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউরো কাপে পর্তুগাল বেশ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে টাইব্রেকারে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বে পর্তুগালের ফর্ম ছিল এককথায় অতিমানবীয়। প্রায় প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে, রেকর্ডসংখ্যক গোল করে এবং অপরাজিত থেকে তারা বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। ২০২৪-২৫ উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে টাইব্রেকারে স্পেনকে হারিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা ঘরে তোলে পর্তুগাল।
লিওনেল মেসির হাত ধরে আবারও একবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আর্জেন্টিনার সমর্থকদের
কোচ রবার্তো মার্তিনেসের ঘোষিত ২০২৬ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে পর্তুগালের রক্ষণ থেকে আক্রমণ—প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে তারকা ও প্রতিভার দারুণ ভারসাম্য। গোলপোস্টের নিচে প্রধান ভরসা দিওগো কোস্তার পাশাপাশি ব্যাক-আপ হিসেবে থাকছেন জোসে, রুই সিলভা ও রিচার্ডো ভেলা। রক্ষণভাগকে ইস্পাতকঠিন করতে ডাক পেয়েছেন রুবেন ডিয়াস, ডিওগো ডালোট, নুনো মেন্ডিস, জোয়াও ক্যানসেলো, নেলসন সেমেডো, গঞ্জালো ইনাসিও, রেনাটো ভেইগা, মাতিয়াস নুনেস এবং থমাস আরাউহো। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণের গতিপথ সচল রাখার দায়িত্বে থাকছেন ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নান্ডো সিলভা, জোয়াও ফেলিক্স, ভিটিনহা, রুবেন নেভেস ও জোয়াও নেভেসের মতো বিশ্বমানের মিডফিল্ডাররা। আর প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে গুঁড়িয়ে দিতে আক্রমণভাগে মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর নেতৃত্বে থাকছেন রাফায়েল লিয়াও, গনসালো রামোস, পেদ্রো নেতো, গনসালো গেডেস, ফ্রান্সিসকো ত্রিনাকাও এবং ফ্রান্সিসকো কনসেসাও।
কাউন্টডাউন শুরু ফুটবল বিশ্বকাপের! কতটা প্রস্তুত নেইমার জুনিয়রের সাম্বা বাহিনী?
প্রাক্তন বেলজিয়াম কোচ রবার্তো মার্তিনেস পর্তুগালের দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের খেলার ধরনে বড়ো পরিবর্তন এনেছেন। রক্ষণাত্মক খোলস থেকে বের হয়ে পর্তুগাল এখন আধুনিক, গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। বর্তমান ফর্মে ব্রুনো ফার্নান্দেস এবং বার্নার্দো সিলভা তাঁদের নিজ নিজ ক্লাবের হয়ে দুর্দান্ত খেলছেন। রাফায়েল লিয়াওয়ের উইং ধরে গতি এবং ডিলিং ক্ষমতা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য বড়ো আতঙ্কের কারণ। রোনালদোও জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর গোল করার সহজাত দক্ষতা ধরে রেখেছেন। সাম্প্রতিক প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে দলের দলগত রসায়ন এবং বেঞ্চের শক্তি মার্তিনেসের পরিকল্পনাকে সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। পর্তুগালের শক্তির জায়গা তাদের মাঝমাঠের ক্রিয়েটিভিটি এবং আক্রমণে বিকল্পের প্রাচুর্য। যদি ব্রুনো ও বার্নার্দো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে পারেন, তবে পর্তুগালকে থামানো অসম্ভব হবে। তবে দলটির মূল চ্যালেঞ্জ হবে নকআউট পর্বের বড়ো ম্যাচগুলোতে চাপের মুখে মানসিক দৃঢ়তা বজায় রাখা। রোনাল্ডোর বয়স এবং গতি কমে যাওয়াকে মার্তিনেস কীভাবে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করেন, সেটিও দেখার বিষয় হবে। গ্রুপ পর্বের বাধা টপকে নকআউট পর্বে ফ্রান্স, ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তিদের হারাতে হলে পর্তুগালকে তাদের ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’ এর সেরা ফুটবলটা উপহার দিতে হবে। সব মিলিয়ে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এই সম্ভাব্য শেষ অধ্যায়টিকে একটি রূপকথার সমাপ্তি দিতে পর্তুগাল এবার তাদের ইতিহাসের সেরা বাজি ধরতে প্রস্তুত। উল্লেখ্য আগামী ১২ জুন থেকে শুরু হতে চলেছে ফুটবল বিশ্বকাপের মহাযুদ্ধ। গ্রুপ কে- তে পর্তুগালের সঙ্গে রয়েছে উজবেগিস্থান, কলম্বিয়া, ও ডিআর কঙ্গো। ১৭ জুন রোলান্ডোরা নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছে ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে। ২৩ জুন পর্তুগালের দ্বিতীয় ম্যাচ উজবেগিস্থানের বিরুদ্ধে। আর ২৮ জুন পর্তুগাল খেলবে কলোম্বিয়ার বিরুদ্ধে।
