প্রিয়াংশু মণ্ডল, প্রতিনিধি
ময়দান আপডেট: বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে আর্জেন্টিনা মানেই এক পরম আবেগ, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেই। উরুগুয়ের মাটিতে আয়োজিত সেই প্রথম আসরেই দুর্দান্ত খেলে রানার্স-আপ হয়েছিল তারা, যেখানে গুইলার্মো স্ট্যাবিলের গোলবন্যা আকাশী-নীলদের আগমনী বার্তা দিয়ে রেখেছিল। তবে এই গৌরবময় পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না; পুরো ইতিহাসে আর্জেন্টিনা কেবল ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। এছাড়া অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তারা ১৯৩৮, ১৯৫০ এবং ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণই করেনি।

এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে ১৯৭৮ সালে, যখন ঘরের মাঠে মারিও কেম্পেসের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ভর করে ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বজয় করে আর্জেন্টিনা। এর আট বছর পর, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনার একক রাজত্ব। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ ফুটবল ইতিহাসের অমর স্মৃতি হয়ে আছে, যে আসরের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় তারা। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ভাঙাচোরা দল নিয়ে আর্জেন্টিনা আবার ফাইনালে উঠলেও পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়ে। এর পরবর্তী দুই দশক আর্জেন্টিনার ফুটবলের জন্য ছিল কেবলই ট্র্যাজেডি ও আক্ষেপের গল্প। বিশেষ করে ২০১৪ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা আবার ফাইনালে উঠলেও, মারাকানা স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্স-আপ ট্রফি নিয়েই মেসিকে মাঠ ছাড়তে হয়। তবে নিয়তি মেসির জন্য এর চেয়েও মহিমান্বিত এক মঞ্চ সাজিয়ে রেখেছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারের ধাক্কা সামলে প্রতিটি ম্যাচে জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখায় স্কালোনির দল। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ৩-৩ সমতার পর টাইব্রেকারে জয় ছিনিয়ে নিয়ে ৩৬ বছরের খরা কাটায় আর্জেন্টিনা, আর বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠতম নায়ক হিসেবে লিওনেল মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ শূন্যস্থানটি পূরণ করেন।

কাতার জয়ের সেই গৌরবময় অধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ২০২৬ সালের বর্তমান বিশ্বকাপেও অপ্রতিরোধ্য যাত্রা বজায় রাখে তারা। একের পর এক বাধা পেরিয়ে সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রেখেছে আলবিসেলেস্তেরা, যেখানে ঐতিহাসিক শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তারা। ১৯৩০ সাল থেকে ২০২৬—আর্জেন্টিনার এই দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে যে ট্রফি আসুক বা না আসুক, ফুটবলের আদি ও অকৃত্রিম রোমাঞ্চ চিরকালই এই নীল-সাদা জার্সির মাঝেই বন্দি থাকবে।
