প্রিয়াংশু মণ্ডল, প্রতিনিধি
ময়দান আপডেট: আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া, হরমোনজনিত জটিলতায় ভোগা এক শীর্ণকায় বালক থেকে ফুটবল বিশ্বের অবিসংবাদিত সম্রাট হয়ে ওঠার এই পথচলাটি কেবল অসামান্য প্রতিভার গল্প নয়, বরং এটি হলো সীমাহীন ট্র্যাজেডি পেরিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার এক জীবন্ত রূপকথা। শৈশবে পিএসজি বা অন্য কোনো বড় ক্লাবের মতো আর্থিক সক্ষমতা রোজারিওর স্থানীয় ক্লাবগুলোর না থাকায় যখন মেসির চিকিৎসার চড়া খরচ বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা তাদের বিখ্যাত অ্যাকাডেমি ‘লা মাসিয়া’তে নিয়ে আসে তাঁকে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় ক্লাব ফুটবলে তাঁর অতিমানবীয় রাজত্ব, যেখানে একের পর এক লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ট্রেবল জিতে নিজেকে ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। কিন্তু ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করলেও দেশের জার্সি গায়ে তাঁর ক্যারিয়ার হয়ে উঠেছিল এক চরম ট্র্যাজেডিতে ভরা; ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে ট্রফির খুব কাছ থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসা এবং এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টানা দুবার টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা খোয়ানোর বেদনা, বিশেষ করে ২০১৬ সালের ফাইনালে নিজের পেনাল্টি মিস করার গ্লানি সহ্য করতে না পেরে মাত্র ২৯ বছর বয়সে কান্নাভেজা চোখে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। তবে বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের প্রার্থনা, সতীর্থদের আকুতি ও দেশের আপামর মানুষের ভালোবাসার টানে নিজের সিদ্ধান্ত বদলে আবারও আকাশী-নীল জার্সিতে ফিরে আসেন তিনি, যা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক ঐতিহাসিক কামব্যাক।

এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পর কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে একঝাঁক তরুণ ও লড়াকু যোদ্ধাদের নিয়ে তৈরি হওয়া এক নতুন আর্জেন্টিনা দল নিয়ে অবশেষে ২০২১ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় করে দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটান মেসি, যার পরপরই উয়েফা চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নিশ্চিত করেন ‘ফিনালিসিমা’ ট্রফি। এরপর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ঘটে সেই পরম শাপমোচন, যেখানে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে অভাবনীয় হারের ধাক্কা সামলে প্রতিটি নকআউট ম্যাচে গোল করে এবং ফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোলসহ ৩-৩ সমতার পর টাইব্রেকারে জয় ছিনিয়ে নিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনার অধরা তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেন মেসি, যা তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ (GOAT) হিসেবে সিংহাসনে বসিয়ে দেয়। জাতীয় দলের এই অমরত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের একক স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ক্যারিয়ারে রেকর্ড সর্বোচ্চ *৮ বার ব্যালন ডি’অর* (২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৯, ২০২১ এবং ২০২৩) জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েন, যা প্রমাণ করে যে একের পর এক হৃদয়ভাঙা হারের পরও হাল না ছেড়ে লড়াই চালিয়ে গেলে কীভাবে নিয়তি শেষ পর্যন্ত তাকে বিজয়ের মুকুট পরিয়ে দেয় এবং এক সাধারণ ট্র্যাজিক হিরো থেকে ফুটবল ঈশ্বরের আসনে উন্নীত করে।
আলবিসেলেস্তেদের মহাকাব্য!১৯৩০ থেকে ২০২৬ আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের সফর
