ময়দান আপডেট: ১৬ বছর পর ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে আবার নয়া ইতিহাস লিখল স্পেন। দুইবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে দুইবারই চ্যাম্পিয়ন হল তারা। আর এই বিশ্বকাপ জয় স্পেন ফুটবল বিশ্বকে অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গেল। শুধুমাত্র সুপারস্টার মহাতারকা দলে থাকলেই কিংবা দলে বড় নাম দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা যায় না। বিশ্বকাপ জয়ের জন্য দরকার হয় প্রতিভার ও সঠিক রণকৌশলের। কারণ এইবারের বিশ্বকাপের শুরু থেকে স্পেনকে নিয়ে তেমন কোন বড় প্রত্যাশা ছিলনা সমর্থকদের। অথচ প্রথমে পর্তুগাল, তারপর ফ্রান্স এবং আর্জেন্টিনা যেভাবে একের পর এক বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার ফেভারিট দলদের ছিটকে দিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের শিরোপা জিতে নিল স্প্যানিশরা, তা বহুকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে। অসাধারণ দৃষ্টিনন্দন এবং বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল উপহার দিয়ে চমকে দিয়েছে লাল হলুদ বাহিনী।

লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ হওয়ায় মেসির হাতে শেষবারের জন্য বিশ্বকাপ ট্রফিটা দেখবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন সমর্থকরা। তবে বিশ্বকাপের ফাইনালে রবিবার মধ্যরাতে আক্রমণ থেকে বল পজিশন সব বিভাগেই আর্জেন্টিনাকে টেক্কা দিল স্পেন। ঠিক যেভাবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে গোটা ম্যাচ জুড়ে কার্যত খুঁজে পাওয়া যায়নি, একতরফা দাপট দেখিয়েছিল স্প্যানিশরা। ঠিক তেমন ভাবে বিশ্বকাপের ফাইনালেও গ্যালারি জুড়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের চাপ সামলেও, টেনশন ফ্রি ফুটবল খেলে গোটা ম্যাচ জুড়ে আধিপত্য নিজেদের হাতেই রাখল স্পেন। আর্জেন্টিনাকে গোল করা তো দূরের কথা আক্রমণ তৈরির সুযোগও দিল না স্প্যানিশরা। মেসিকে বল পায়ে খুব বেশি দেখাও গেল না বিশ্বকাপের ফাইনালে। বরং ঘনঘন আক্রমণে উঠছিল গোটা ম্যাচেই স্পেনের ফুটবলাররা। বলের দখল অধিকাংশ সময় নিজেদের পায়েই রাখল তারা। যদিও স্পেন প্রচেষ্টা করলেও, বারবার স্পেনের আক্রমণ রেখে দিচ্ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে একমাত্র নজর কারা দলের গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তার অসাধারণ গোল রক্ষকের ভূমিকা মুগ্ধ করেছে ফুটবল প্রেমীদের। না হলে হয়তো অনেক আগেই অনেক বেশি গোলে ম্যাচ জিতে যেতে পারত স্পেন।তবে বারবার স্পেনের আক্রমণ প্রতিরোধ করে দেন মার্টিনেজ। তবে শেষ রক্ষা হল না। ৯০ মিনিটের ম্যাচ গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ করায় সংযুক্তি সময়ে, আর সেখানেই ১০৬ মিনিটে অবশেষে স্পেনকে জয়সূচক কাঙ্খিত গোলটি এনে দিলেন ফেরান টোরেস। নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে ফেরান তোরেসের শট। এইবার বল বুঝতে পারেননি মার্টিনেজ। জালে জড়িয়ে যেতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন স্পেনের সমর্থকরা। অন্যদিকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গেল মেসিদের। আর এই গোলটা খাওয়ার পর শেষ ১৫ মিনিট মরিয়া হয়ে গোল শোধ করার প্রয়াস করতে থাকে আর্জেন্টিনা। তবে বারবার স্পেনের ডিফেন্সের কাছে আটকে গিয়েছে তারা। ১-০ গোলে ম্যাচ জিতে সাফল্যের শিরোপা ছিনিয়ে নিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জিতে বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে গোটা দল।

অন্যদিকে তখন দেখা যায় নীরবে চোখের জল মুছছেন লিওনেল মেসি। আর সেই সময় মাঠের মধ্যে দেখা যায় ঠিক যেভাবে পর্তুগাল ছিটকে যাওয়ার পর রোনাল্ডোকে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন, তেমন ভাবেই এদিনও মেসির সামনে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন আগামী প্রজন্মের বিশ্ব ফুটবলের ইয়ং স্টার লামিন ইয়ামাল। আর ইয়ামালের দুর্দান্ত প্রতিভাবান ফুটবলকে সম্মান জানিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মেসিও। তবে এইবারে মেসির বিশ্বকাপ জয় তো দূরের কথা, বিশ্বকাপ থেকে কোন পুরস্কারই তিনি পেলেন না! নিরাশ হয়ে ফিরতে হলো তাকে। এইবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার গোল্ডেন বুট পুরস্কার জিতে নিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনি করেছেন দশটি গোল,সেখানে মেসি আটটি। বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার অর্থাৎ সোনার বল জিতে নিলেন স্পেনের মাঝমাঠের প্রাণ ভ্রোমরা রদ্রি। একের পর এক ম্যাচে তিনি যেভাবে স্পেনকে সাফল্য এনে দিয়েছেন এবং গোটা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছেন তাই তাকেই এই পুরস্কার তুলে দিল ফিফা। আর বিশ্বকাপের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার গোল্ডেন গ্লাভস যে স্পেনের সিমন পাবেন তা আগেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ গোটা বিশ্বকাপে স্পেন মাত্র একটি গোল খেয়েছে। ফলে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়ে স্পেনকে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন করায় তাঁর ভূমিকা ছিল অন্যতম। পাশাপাশি বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান ফুটবলারের পুরস্কার পেলেন স্পেনের মাত্র ১৯ বছরের তরুণ তুর্কি পাউ কুবারসি। মাত্র ১৯ বছরের এই ফুটবলার স্পেনের রক্ষণ সামলেছেন। তিনি ছিলেন বলে সিমনকেও কম কষ্ট করতে হয়েছে। পাশাপাশি আক্রমণেও বল বাড়িয়েছে কুবারসি। এত অল্প বয়সে তার খেলা মুগ্ধ করেছে ফুটবল বিশ্বকে। সব মিলিয়ে বিশ্ব ফুটবলে মেসি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। আর্জেন্টিনা সমর্থকরা হয়তো মেসির এইভাবে বিদায়টা মন থেকে মানতে পারছেন না। তবে অন্যদিকে যেভাবে চমক দিয়ে স্পেন বিশ্বকাপ দ্বিতীয়বারের জন্য জিতে নিল, তাদের প্রতিভাকে কুর্নিশ জানাতেই হবে ফুটবল প্রেমীদের।
