সৌরভ রায় ও অঙ্কিত ঘোষ, প্রতিনিধি
ময়দান আপডেট: তখন সময় বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯-টা। একদিকে যাদবপুর সংলগ্ন কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে তখন উৎসবের মেজাজ। এযেন অকাল দীপাবলি ও হোলি একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে স্টেডিয়াম জুড়ে। গোটা স্টেডিয়ামের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত, যেদিকেই চোখ যাচ্ছে লাল-হলুদ রঙের উৎসবে মাতোয়ারা হাজার-হাজার ইস্টবেঙ্গল সমর্থক। কোচ অস্কার থেকে দলের ফুটবলারদের নাম নিয়ে জনগর্জনে কাঁপছে গোটা এলাকা। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এসেছে এই সাফল্যের দিন! বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, আবেগ, আনন্দ অশ্রু যেন বাগ মানছে না! আর হবে নাইবা কেন, বছরের পর বছর আইএসএল এসেছে চলে গেছে, কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের ভাগ্যে ট্রফির খড়া কাটেনি। শেষ কয়েকটা মরসুম দলের খেলা হতাশ করেছে সমর্থক থেকে কর্মকর্তাদের। লিগ টেবিলে ৯, ১০ এ থাকতে থাকতে এবং প্রতিবেশী ক্লাবের সাফল্য দেখতে-দেখতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলেন লাল-হলুদ সমর্থকরা। তবে এবার অবশেষে সেই চিরপ্রতিক্ষিত সাফল্য আসল ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে। ইজ্জেজারি,রশিদ, মিগুয়েল থেকে জিকসন, আনোয়ার, শৌভিকরা ইতিহাস রচণা করল আইএসএলের মঞ্চে। আর কোচ অস্কার ব্রুঁজোকে ঘিরে গোটা মরসুম জুড়ে কম বিতর্ক হয়নি! বহু সমালোচনা, বহু সমর্থকদের প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে অস্কারকে। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত সমালোচকদের যোগ্য জবাব দিয়ে প্রথমবার ইস্টবেঙ্গলকে আইএসএল চ্যাম্পিয়ন করে লাল-হলুদ ক্লাবের ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে রাখলেন স্বর্ণাক্ষরে।

এই সাফল্য সমর্থকদের হৃদয়ে থেকে যাবে বহু বছর। আর সাফল্যের পর একদিকে ট্রফি নিয়ে যেমন সেলিব্রেশনে মাতলেন কোচ অস্কার থেকে গোটা দল, ঠিক তেমনি সাংবাদিক সম্মেলনে সমস্ত সাফল্য ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কর্মকর্তা, ইমামি থেকে সমর্থকদের উৎসর্গ করে ধন্যবাদ জানালেন অস্কার। বললেন, এই সাফল্য তিনি সারা জীবন মনে রাখবেন।

ইন্টারকাশীর বিরুদ্ধে খেলার প্রথমার্ধে এক গোলে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত কামব্যাক লাল-হলুদের। খেলার প্রথমার্ধে গোল খেয়ে সমর্থকদের টেনশন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন দলের ফুটবলাররা। মনে হচ্ছিল শেষ পর্যন্ত ইন্টারকাশীর কাছে হেরে বিদায় নিতে হবে না তো ! তবে ফুটবল ঈশ্বর যোগ্য দলকে নিরাশ করেন না! তার প্রমাণ পাওয়া গেল আরও একবার। মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল দুই দলই লিগ টেবিলে ১৩ ম্যাচ খেলে সমসংখ্যক ২৬ পয়েন্ট নিয়ে শেষ করলেও, গোল পার্থক্যে অনেক এগিয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল। মোহনবাগান ২৬ পয়েন্ট পেলেও, গোটা মরসুম জুড়ে খারাপ ফুটবল উপহার দিয়ে হতাশ করেছেন সবুজ-মেরুন সমর্থকদের। প্রত্যেক ম্যাচে সহজ গোলের সুযোগ নষ্ট করেছে মোহনবাগান। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মুম্বই সিটির বিরুদ্ধে যেমন মোহনবাগান জিততে পারেনি, তেমনি সহজ প্রতিপক্ষ ইন্টারকাশীর কাছেও আটকে গিয়েছে। অথচ ইস্টবেঙ্গল মুম্বইকে তাদের ঘরের মাঠে হারানো থেকে শুরু করে শেষ ম্যাচে ইন্টারকাশীর বিরুদ্ধেও ২-১ গোলে জয় ছিনিয়ে নিল। ফলে দিমি-কামিংস-ম্যাকলারেনরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো ফুটবল যে উপহার দিতে পারেননি তা স্বীকার করেছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। সেখানে অনেকটাই ভালো ছন্দে পাওয়া গিয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে। সুতরাং যোগ্য দল হিসাবেই চ্যাম্পিয়নের শিরোপা জিতে নিল তারা।

বৃহস্পতিবার কিশোরভারতী স্টেডিয়াম জুড়ে যখন উৎসবের মেজাজ, তখন অন্যদিকে যুবভারতী স্টেডিয়াম জুড়ে শুধুই একরাশ হতাশা আর বিষন্নতা! যদিও নিজেদের শেষ ম্যাচে স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লির বিরুদ্ধে এক গোলে পিছিয়ে থেকেও, শেষ দিকে মনবীর ও ম্যাকলারেনের গোলে ২-১ এ জয় পেয়েছে মোহনবাগান। জিতলে কি হবে, ট্রফি অধরাই থেকে গেল সার্জিও লোবেরার দলের কাছে। দ্বিতীয় স্থানে থেকেই মরসুম শেষ করল মোহনবাগান। ফলে মোহনবাগান জেতার পরেও, দলের ফুটবলারদের শুনতে হল গো-ব্যাক স্লোগান। ফুটবলারদের গাড়ি ঘিরেও চলল বিক্ষোভ, প্রতিবাদ। তার জেরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যুবভারতীর সামনের রাস্তা। গোটা ম্যাচ জুড়ে এদিন অসংখ্য সহজ গোলের সুযোগ নষ্ট করেন মোহনবাগান ফুটবলাররা। একটা সময় মনে হচ্ছিল দিল্লির কাছে হেরে সফর শেষ করবে সবুজ-মেরুন। যদিও শেষ পর্যন্ত মান বাঁচালো দল। কিন্তু এত ভালো টিম এবং অন্যতম সেরা কোচ থাকার পরেও দলের এত গোলের সুযোগ নষ্ট করা মেনে নিতে পারছেন না মেরিনার্সরা।

অথচ অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার যেখানেই বলেই দিয়েছিলেন আমরা ৯ থেকে উঠে এসে ৪-৫ নম্বরে থাকতে পারলেই খুশি, সেখান থেকে দুর্দান্ত কামব্যাক করে দলকে ট্রফি এনে দিয়ে শাপমোচন করলেন অস্কার। এদিন ম্যাচের ৪৯ মিনিটে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গোল করেন ইউসুফ ইজ্জেজারি, ৭২ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটি করে দলের জয় সুনিশ্চিত করেন মহম্মদ রশিদ। লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গোল্ডেন বুটের পুরস্কার জিতে নিলেন ইজ্জেজারি।

ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের এই সাফল্যের পর আগামী মরসুমেও যে অস্কারকে ধরে রাখতে সমস্ত রকম প্রচেষ্টা চালাবেন ইমামি কর্তারা তা বলা যেতেই পারে। শুক্রবার বিকেলে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে ট্রফি নিয়ে সেলিব্রেশন হবে সমর্থকদের উপস্থিতিতে। পাশাপাশি ফেডারেশনের পক্ষ থেকে ইস্টবেঙ্গল মাঠে ফুটবলারদের পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। উপস্থিত থাকবেন ক্লাবের কর্মকর্তা থেকে সমর্থকরা।
