ময়দান আপডেট: প্রত্যেক বছরই খেলার জগতে থাকে একাধিক সাফল্য-ব্যর্থতা থেকে রেকর্ড গড়ার নজির। কখনও নতুন চ্যাম্পিয়নকে খুঁজে পায় বিশ্ব, আবার কখনও নিজের জয়ের ধারা অব্যাহত রাখে কোনও দল। ২০২৫ সালেও রয়েছে ফুটবল জগতে বহু উথ্থান-পত্তন থেকে প্রাপ্তি-হারানোর খবর । এমনই কিছু খবর রয়েছে যা চমকে দিয়েছে গোটা বিশ্ব ফুটবলকে। সব মিলে কেমন গেল ফুটবল জগতে ২০২৫ ? সেই নিয়ে দেখে নেব রাউন্ডআপ ফুটবল ২০২৫ –
1. ২০২৫ সালের বর্ষবরণ শুরুই বাংলার ফুটবলের সাফল্য দিয়ে। কাগজে-কলমে যদিও ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা। বহু বছর পর ইতিহাস রচনা করে সন্তোষ ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয় কোচ সঞ্জয় সেনের হাত ধরে বাংলার দল। হায়দরাবাদের মাটিতে সন্তোষ ট্রফির ফাইনালে ১-০ গোলে কেরালাকে হারিয়ে স্বপ্নের সাফল্য ছিনিয়ে নেয় বঙ্গ ব্রিগেড। যা কার্যত ২০২৫ সালের নিউ ইয়ার গিফট বলা যেতেই পারে। ফাইনালে দলের হয়ে একমাত্র গোলটি উপহার দেন রবি হাঁসদা। আর এই সাফল্যের জেরে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে গোটা বাংলার ক্রীড়া জগত। বিভিন্ন ক্লাব সহ আইএফএ ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও সংবর্ধনা জানান হয় সঞ্জয় সেনের দলকে। পাশাপাশি দলের সমস্ত ফুটবলারদের সাফল্যের পুরস্কার হিসাবে পুলিশে চাকরি দেওয়া হয় রাজ্য সরকারের তরফ থেকে। ( সন্তোষ জয়ী বাংলা )

2. ২০২৫ সালের শুরুটা মোহনবাগানের জন্য ছিল অসাধারণ। একের পর এক সাফল্য ইন্ডিয়ান সুপার লিগে। ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া আইএসএলের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালের ১২ মার্চ। আর ইতিহাস রচনা করে একই বছরে আইএসএল শিল্ড ও ট্রফি জয় সবুজ-মেরুনের। কোচ হোসে মোলিনার হাত ধরে দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়ে দ্বিতীয়বার আইএসএল শিল্ড চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান। আইএসএলের গ্রুপ পর্বে ২৪ ম্যাচ খেলে ১৭ টা জয়, ৫৬ পয়েন্ট নিয়ে শিল্ড জয় করে মোহনবাগান। ৪৮ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে এফসি গোয়া। আর ফাইনালে মুখোমুখি হয় মোহনবাগান ও ব্যাঙ্গালুরু এফসি। জেসন কামিংস ও জেমি ম্যাকলারেনের গোলে ২-১ এ সুনীল ছেত্রীর ব্যাঙ্গালুরুকে হারিয়ে আইএসএল ট্রফি জয় সবুজ-মেরুনের। ( আইএসএল শিল্ড ও ট্রফি মোহনবাগানের )

3. ২০২৪ সালে শুরু হওয়া আইলিগ ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল শেষ হয়। আর ২০২৫ সালে আইলিগ চ্যাম্পিয়নের শিরোপা জিতে নেয় কোচ আন্তেনিও লোপেজ হাবাসের নেতৃত্বে ইন্টারকাশি। ৪২ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। অন্যদিকে ৪০ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে চার্চিল ব্রাদার্স। ৩৭ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রিয়াল কাশ্মীর। (আইলিগ জয়ী ইন্টারকাশি)
4. ২০২৫ সালে ভারতীয় ফুটবলে অনবদ্য সাফল্য এফসি গোয়ার। ২০ এপ্রিল থেকে ভুবণেশ্বরে শুরু হয় কলিঙ্গ সুপার কাপের আসর। যেখানে অংশ নেয় মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল সহ ১৫ টি দল। এই সুপার কাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় মোহনবাগান ও এফসি গোয়া। এই ম্যাচে ৩-১ গোলে মোহনবাগানকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে আসে এফসি গোয়া। অন্যদিকে দ্বিতীয় সেমিফাইনাল ম্যাচে ১-০ গোলে মুম্বই সিটি এফসিকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় জামশেদপুর এফসি। আর ফাইনালে গোয়া-জামশেদপুর ম্যাচে ৩-০ গোলে জামশেদপুরকে হারিয়ে সুপার কাপ জিতে নেয় এফসি গোয়া। ( সুপার কাপ চ্যাম্পিয়ন গোয়া)

5. ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই থেকে ২৩ অগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ডুরান্ড কাপ। ২৪ দলের ডুরান্ড কাপের আসর বসে এই বছর। বাংলার তিন প্রধানের পাশাপাশি চতুর্থ দল হিসাবে এই বছর ডুরান্ড কাপে অংশ নেয় ডায়মন্ড হারবার এফসি। আর প্রথমবার অংশ নিয়েই চমক ডায়মন্ড হারবারের। ফাইনালে নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেডের সঙ্গে খেলতে নামে ডায়মন্ড। তবে ফাইনালে ৬-১ গোলের বিরাট ব্যবধানে নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেডের কাছে হার কিবু ভিকুনার দলের। চ্যাম্পিয়ন হয় নর্থ-ইস্ট। অন্যদিকে কোয়ার্টার ফাইনালে ডার্বিতে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় মোহনবাগান। আর সেমিফাইনালে ডায়মন্ড হারবার এফসির কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় লাল-হলুদ বাহিনী। (ডুরান্ড চ্যাম্পিয়ন নর্থ-ইস্ট)

6. ২৫ জুন থেকে শুরু হয় এই বছরের কলকাতা ফুটবল লিগ। শেষ হয় ৬ সেপ্টেম্বর। ২৬ দলকে ২ টি গ্রুপে ভাগ করে বনাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে টুর্নামেন্টের সূচনা হয়। আর এই বছরের কলকাতা ফুটবল লিগের ফাইনালে ইউনাইটেড স্পোর্টসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ইস্টবেঙ্গল। পাশাপাশি গতবছর আইনি জটিলতার কারণে লিগের চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করার বিষয়টি আদালতে ঝুলে ছিল। আদালত ইস্টবেঙ্গল ও ডায়মন্ড হারবারের অভিযোগের সমস্ত দিক বিচার করে ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে। ফলে এই বছর একই দিনে পর-পর দুই বছরের দুটি লিগের ট্রফি তুলে দেওয়া হয় ইস্টবেঙ্গলের হাতে। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন সমর্থকরা। অন্যদিকে এই বছর লিগে রেলিগেশন হয়ে ফাস্ট ডিভিশনে নেমে গেল সার্দান সমিতি ও আর্মি রেড। তবে এই বছর কলকাতা লিগে একাধিক ম্যাচে রেফারির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উত্তেজনা ছড়ায় বেশ কিছু ম্যাচে। পাশাপাশি লিগের কিছু ম্যাচে ফিক্সিংয়ের অভিযোগও সামনে আসে। তাই কলকাতা লিগ শেষ হতেই পুলিশকে ফিক্সিং নিয়ে তদন্তের ভার তুলে দেয় আইএফএ। তদন্ত শুরু করে কলকাতা পুলিশ গ্রেফতার করে ফিক্সিং কান্ডে ৩ অভিযুক্তকে। ( জোড়া কলকাতা লিগ ইস্টবেঙ্গলের )

7. বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর বঙ্গ ফুটবল সংস্থা আইএফএর উদ্যোগে ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত হয় আইএফএ শিল্ড। ৮ থেকে ১৮ অক্টোবর ৬ টি দলকে নিয়ে আইএফএ শিল্ডের আয়োজন করা হয়। যেখানে বাংলার দুই দল মহামেডান ও ডায়মন্ড হারবারকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও, তারা অংশ গ্রহণ করেনি। তবে বাংলার তিন দল মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও ইউনাইটেড স্পোর্টস যোগ দেয় শিল্ডে। অন্য রাজ্য থেকে অংশ নেয় নামধারি, শ্রীনিধি ডেকান ও গোকুলাম কেরালা এফসি। গ্রুপ এ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফাইনালে ওঠে ইস্টবেঙ্গল। অন্যদিকে গ্রুপ বি থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফাইনালে ওঠে মোহনবাগান। আর ফাইনালে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ডার্বি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় যুবভারতীতে। আর ডার্বিতে পেনাল্টিতে ৫-৪ গোলে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড ট্রফি ঘরে আনে মোহনবাগান। ( আইএফএ শিল্ড জয় মোহনবাগানের)

8. ২০২৫ সালের শুরুটা মোহনবাগানের জন্য ছিল অনবদ্য। কিন্তু ডুরান্ড কাপ থেকেই ব্যর্থতা শুরু মোহনবাগানের। আর তারই মধ্যেই ইরানে অনুষ্ঠিত এএফসি কাপের ম্যাচ খেলতে দল পাঠায় নি মোহনবাগান। সেই নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সবুজ-মেরুন সমর্থকরা। ইরান না যাওয়ার কারণ স্পষ্ট করেনি ম্যানেজমেন্ট। বলা হয় দলের ফুটবলাররা নাকি নিরাপত্তাজনিত কারণে যেতে রাজি নয়। তবে আন্তর্জাতিক স্তরের ম্যাচে মোহনবাগান অংশ না নেওয়ায় এবং মিডিয়া ম্যানেজারের অপসারণ দাবি করে আইএফএ শিল্ডের মোহনবাগানের প্রত্যেক ম্যাচের দিন গ্যালারিতে গো-ব্যাক ম্যানেজমেন্ট স্লোগান তুলে সরব হন মেরিনার্সরা। এমনকি কিশোরভারতীর সামনে সমর্থকদের প্রতিবাদ হঠাতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। তার জেরে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। আহত হন বেশ কিছু সমর্থক। শিল্ডের ফাইনালের দিনেও গ্যালারিতে মৌন প্রতিবাদ করেন সমর্থকরা। পাশাপাশি মোহনবাগানের নির্বাচনী প্রচার ঘিরে ২০২৫ সালে উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা রাজ্য। দেবাশীষ ও সৃঞ্জয় দুই পক্ষই ভোটের সময়ে সমর্থকদের জন্য অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেবাশীষ দত্ত সভাপতি ও সৃঞ্জয় বসু সচিব পদে একসঙ্গে কমিটি গঠন করেন। কিন্তু সমর্থকদের দাবিদাওয়া নিয়ে কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ায়, মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এবং ক্লাবের কাছেও চিঠি দিয়ে প্রতিবাদ জানান মেরিনার্সরা। ( মেরিনার্সদের বিক্ষোভ, উত্তপ্ত মোহনবাগান )

9. ২০২৫ সালে জোড়া সুপার কাপ অনুষ্ঠিত হয়। এই বছর আইএসএল পিছিয়ে যাওয়ায়,এপ্রিল মাসে কলিঙ্গ সুপার কাপের পর ডিসেম্বর মাসে গোয়ায় অনুষ্ঠিত হল সুপার কাপ। যেখানে আবারও চ্যাম্পিয়ন এফসি গোয়া। একই বছরে দুটো সুপার কাপের ট্রফি নিজেদের নামে করে নিল মানালো মার্কোয়েজের দল। গোয়ায় আয়োজিত সুপার কাপে চূড়ান্ত হতাশাজনক ফলাফল মোহনবাগানের। গ্রুপ পর্বে চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে জয় পেলেও, সহজ প্রতিপক্ষ ডেম্পোর বিরুদ্ধেও ম্যাচ ড্র করে মোহনবাগান। আর এরপর ফাতোরদা স্টেডিয়ামে ইস্টবেঙ্গলের কাছেও গোলশূন্য ড্র করে নিরাশ হয়েই কলকাতায় ফিরে আসে মোলিনার দল। অন্যদিকে সেমিফাইনালে পঞ্জাবকে বড় ব্যবধানে হারালেও,ফাইনালে এফসি গোয়ার কাছে পেনাল্টিতে ৫-৬ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় লাল-হলুদের। তবে মোহনবাগানের জঘন্য ফলাফলের পর চরম সমালোচনার মুখে পড়েন মোলিনা। ম্যানেজমেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করায় মোহনবাগান কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মোলিনাকে। ডিসেম্বরের ১১ তারিখ মোহনবাগানের নয়া কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন সার্জিও লোবেরা।(সুপার কাপ গোয়ার,মোলিনা অধ্যায়ের সমাপ্তি)

10. ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৬৯তম ব্যালন ডি’অর চ্যাম্পিয়ন হলেন পিএসজি-র ওসমান ডেম্বেলে। পাশাপাশি বর্ষসেরা ক্লাব হিসেবে স্বীকৃতি পেল পিএসজি। অন্যদিকে মহিলাদের ফুটবলে টানা তৃতীয়বারের জন্য ব্যালন ডি’অর জয়ী হলেন বার্সেলোনার আইতানা বোনমাতি। ব্যালন ডি’অর জেতার সেরা দুই দাবিদার ছিলেন ওস্মান ডেম্বেলে এবং লামিনে ইয়ামাল। তবে বাজিমাত করেন ডেম্বেলে। দ্বিতীয় স্থানে থাকেন ইয়ামাল। পাশাপাশি উল্লেখ্য ২০২৫ সালে বিশ্ব ফুটবলে আরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বর্ষশেষে ডিসেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ১৪ বছর পর আবারও কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। যুবভারতীতে তাঁকে বিশেষ ভাবে সংবর্ধনা জানান হয়। শীতের কলকাতা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মেসিকে ঘিরে চরম উন্মাদনা। (ব্যালন ডি’অর ওসমান ডেম্বেলে)
11. ২০২৫ সালে বিশ্ব ফুটবলে আরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বর্ষশেষে ডিসেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ১৪ বছর পর আবারও কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। তবে যুবভারতীতে মেসি ঢুকতেই চরম বিশৃঙ্খলা। মেসিকে দেখতে না পেয়ে গ্যালারি ভাঙচুর। রণক্ষেত্র যুবভারতী। মাঠে চেয়ার ও জলের বোতল ছোঁড়ে দর্শকরা। পুলিশের লাঠিচার্জ। বানচাল হয়ে যায় মেসির অনুষ্ঠান। চরম লজ্জার অধ্যায় বাং+লার ফুটবলের। গ্রেফতার করা হয় আয়োজক সংস্থার প্রধান শতদ্রু দত্তকে। যদিও হায়দরাবাদ, মুম্বই ও দিল্লিতে সুন্দর ভাবে আয়োজিত হয় মেসি শো। মেসির সঙ্গে দেখা করেন শচীন-সুনীল ছেত্রীরা। (মেসির অনুষ্ঠান ঘিরে চরম বিশৃঙ্খলা কলকাতায় ! )

