Sunday, May 31, 2026
Homeফুটবলকলকাতার ফুটবলমোহনবাগানের ‘ত্রাতা’ তথা ময়দানের মহীরুহ টুটু বসুর জীবনাবসান! সমাপ্তি এক বর্ণময় যুগের

মোহনবাগানের ‘ত্রাতা’ তথা ময়দানের মহীরুহ টুটু বসুর জীবনাবসান! সমাপ্তি এক বর্ণময় যুগের

সামনেই ডার্বি, গ্যালারি থাকবে, চিৎকার থাকবে, কিন্তু থাকবে না সেই চেনা মানুষটি। তবু আজও যেন বাতাসে ভেসে আসছে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর— ভয় নেই, মোহনবাগান জিতবে।

ময়দান আপডেট: ময়দান আজ স্তব্ধ, গ্যালারিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে শোকের সুর। চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল সেই বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বর, যা দীর্ঘ তিন দশক ধরে সবুজ-মেরুন গ্যালারিতে উন্মাদনা জাগিয়ে রাখত। প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি ফুটবল প্রশাসক, মোহনবাগান রত্ন তথা ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি স্বপন সাধন বসু (টুটু বসু)। কলকাতা ময়দানে কত মানুষ আসে, কত মানুষ যায়। কিন্তু কিছু নাম ইতিহাসের পাতায় এমনভাবে খোদাই করা থাকে যে, সময়ও তা মুছে দিতে পারে না। 

টুটু বসুর জীবন ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। কোনও রূপালি চামচ মুখে দিয়ে তিনি জন্মাননি। তাঁর জীবনের মন্ত্রই ছিল পরিশ্রম আর অদম্য জেদ। নিজের জীবনের লড়াইয়ের কথা তিনি লিখে গিয়েছেন তাঁর আত্মজীবনী ‘শূন্য থেকে শুরু’ বইটিতে। নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক লড়াকু মানুষের সম্পূর্ণ জীবনদর্শন। সত্যিই একদিন তিনি প্রায় শূন্য হাতেই পথ চলা শুরু করেছিলেন, কিন্তু সেই পথ চলা শেষ করেছিলেন সাফল্যের এমন এক শিখরে পৌঁছে, যেখানে খুব কম মানুষই পৌঁছাতে পারেন। শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা থেকে শুরু করে রাজনীতির শীর্ষমহল—সর্বত্রই ছিল তাঁর সমান পদচারণা। ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নয়ের দশকের শুরুতে কলকাতা ময়দানের আর এক কিংবদন্তি কর্তা প্রয়াত ধীরেন দের আমলে তিনি ক্লাবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। তারপর থেকে দীর্ঘ তিন দশক ধরে মোহনবাগান আর টুটু বসু সমার্থক হয়ে উঠেছিল। তাঁর ও বন্ধু অঞ্জন মিত্রের জুটি ভারতীয় ফুটবলে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ক্লাবের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা ছিল না, তা ছিল তাঁর ‘প্রথম প্রেম’। মোহনবাগানকে আধুনিক ফুটবলের পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বড় নামের ফুটবলারদের ক্লাবে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিদেশি চিমা ওকেরিকে বাগানে আনা, কৃশানু দে-বিকাশ পাঁজিকে সই করানো কিংবা মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো প্রবাদপ্রতিম ফুটবলারকে সবুজ-মেরুন জার্সিতে খেলানো—সবই ছিল তাঁর হাতযশ। পরবর্তীকালে হোসে রামিরেজ ব্যারেটোর প্রতি তাঁর স্নেহ কিংবা সনি নর্দেকে সই করিয়ে ক্লাবে নতুন জোয়ার আনা, টুটু বসু মানেই ছিল চমক।মোহনবাগান যখনই কোনো বড় সংকটে বা আর্থিক দুর্যোগে পড়েছে, তখনই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তিনি। ফিফার জরিমানার কোটি টাকা নিজের পকেট থেকে দিতেও তিনি দ্বিতীয়বার ভাবেননি। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত মানসিক শক্তির আধার। যুবভারতীর সেই ঐতিহাসিক ডার্বির কথা আজও সমর্থকরা ভুলতে পারেন না। ম্যাচের দু’দিন আগে তাঁর সেই হুঙ্কার—“বাঙালদের দেখে নেব”, মুহূর্তের মধ্যে যেন বিদ্যুৎ খেলে দিয়েছিল গ্যালারিতে। মাঠে নামার আগেই সমর্থকদের মনে জয়ের ছবি এঁকে দেওয়ার এই জাদুকরী ক্ষমতা কেবল তাঁরই ছিল।

কেবল ক্লাবের অভ্যন্তরেই নয়, ফিফার টাস্ক ফোর্সের সদস্য হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। দীর্ঘদিন সভাপতি পদ অলংকৃত করার পর একসময় হাসিমুখে নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। নেতৃত্বের এই সহজ পাঠ এবং ত্যাগের মানসিকতা তাঁকে ময়দানের অন্য কর্মকর্তাদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছিল। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ক্লাব তাঁকে তাঁদের সর্বোচ্চ সম্মান ‘মোহনবাগান রত্ন’-এ ভূষিত করে। 

তবে সব লড়াইয়েরই একসময় শেষ থাকে। বেশ কিছুদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন এই মহীরুহ। গত সোমবার সন্ধ্যায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে তড়িঘড়ি কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাখা হয় ভেন্টিলেশনে। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা আর তাঁর লড়াকু মানসিকতা – সবই যেন হার মানল প্রকৃতির নিয়মের কাছে।হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন নবনিযুক্ত ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক, এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও তাঁর নিয়মিত খোঁজ নিয়েছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে দ্বিতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় আর শেষরক্ষা হয়নি। মঙ্গলবার গভীর রাতে ৭৮ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন স্বপন সাধন বসু। বুধবার দুপুর ১২ টা নাগাদ তাঁর নশ্বর দেহ নিয়ে আসা হয় তাঁর প্রিয় মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুতে। সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানান অগণিত সমর্থক ও কর্মকর্তারা। উপস্থিত ছিলেন শুধুমাত্র মোহনবাগান নয়, ইস্টবেঙ্গল-মহামেডান থেকে ময়দানের বিভিন্ন ক্লাবের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ফেডারেশন থেকে আইএফএর কর্মকর্তারা। ছিলেন সিএবির আধিকারিক থেকে রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। 

তবে সামনেই ডার্বি, গ্যালারি থাকবে, চিৎকার থাকবে, কিন্তু থাকবে না সেই চেনা মানুষটি। তবু আজও যেন বাতাসে ভেসে আসছে সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর— ভয় নেই, মোহনবাগান জিতবে। টুটু বসুর প্রয়াণে কেবল এক ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ ঘটল না, সমাপ্তি ঘটল ভারতীয় ফুটবল প্রশাসনের এক সোনালী এবং বর্ণময় অধ্যায়ের।

 

একাধিক সহজ গোলের সুযোগ নষ্ট, খারাপ ফুটবল প্রদর্শন! ইন্টার কাশীর কাছে ড্র করে ডার্বির আগে চাপে মোহনবাগান

 

 

 

 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular